
নিজস্ব প্রতিবেদক :
স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়ের স্পষ্ট ও লিখিত বদলির আদেশ কার্যত উপেক্ষা করে নীলফামারী ২৫০ শয্যা বিশিষ্ট জেনারেল হাসপাতালে তত্ত্বাবধায়কের দায়িত্বে অবৈধভাবে বহাল রয়েছেন ডা. আবু আল হাজ্জাজ এ ঘটনা এখন আর প্রশাসনিক ব্যত্যয় নয়, বরং স্বাস্থ্য খাতে ক্ষমতার দাপট ও প্রাতিষ্ঠানিক দুর্নীতির নগ্ন উদাহরণ হিসেবে বিবেচিত হচ্ছে। অভিযোগ উঠেছে, স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের পরিচালক (প্রশাসন) ডা. এবি এম আবু হানিফের প্রত্যক্ষ প্রশ্রয় ও প্রভাবেই মন্ত্রণালয়ের নির্দেশ কাগজে-কলমে সীমাবদ্ধ হয়ে পড়েছে।
বিশ্বস্ত প্রশাসনিক সূত্র ও আন্দোলনকারী পক্ষের দাবি অনুযায়ী, ডা. আবু আল হাজ্জাজকে অন্যত্র বদলির দাবি জানানো হচ্ছে দীর্ঘদিন যাবৎ। এখানে ডা : আব্দুল্লাহেল মাফী, যিনি ২০ তম বিসিএস ( স্বাস্থ্য) কর্মকর্তা তাকে এবং উক্ত হাসপাতালে সহকারী পরিচালক পদে কর্মরত ছিলেন, মন্ত্রনালয় আড়াই মাস আগে তাকে তত্বাবধায়ক হিসেবে দায়িত্ব দেন এবং উপপরিচালক পদে পরবর্তী পদায়ন না হওয়া পর্যন্ত তত্বাবধায়ক( সহকারী পরিচালক সমমান) ইনসিটু হিসেবে পদায়ন করলেও ডা: হাজ্জাজ তত্বাবধায়ক পদের দায়িত্বভার হস্তান্তর করেন নাই। উল্টো নিজস্ব বলয় ও রাজনৈতিক প্রভাব কাজে লাগিয়ে তত্ত্বাবধায়ক পদের দায়িত্ব ও আয়ন-ব্যয়ন ক্ষমতা কার্যত জবরদখল করে রেখেছেন। এর বিপরীতে নবনিযুক্ত তত্ত্বাবধায়ক ডা. আব্দুল্লাহেল মাফি—একজন জ্যেষ্ঠ, অভিজ্ঞ ও সুনামধন্য কর্মকর্তা—এখনো দায়িত্বভার বুঝে পাননি। ফলে প্রশাসনিক শৃঙ্খলা ভেঙে পড়েছে এবং জ্যেষ্ঠ কর্মকর্তাকে জুনিয়রের অধীনে কাজ করতে বাধ্য হওয়ার নজিরবিহীন ও অপমানজনক পরিস্থিতি তৈরি হয়েছে।
এই অনাকাঙ্ক্ষিত ও অস্বাভাবিক পরিস্থিতি নিয়ে ডা. মাফি মন্ত্রণালয়ের সচিব বরাবর লিখিতভাবে নিজের বিব্রতবোধ ও অসহায়ত্বের কথা জানিয়েছেন বলে সংশ্লিষ্ট সূত্র নিশ্চিত করেছে। কিন্তু প্রশ্ন উঠছে—এত গুরুতর অভিযোগের পরও কেন কার্যকর পদক্ষেপ নেই?
ডা. আবু আল হাজ্জাজের রাজনৈতিক পরিচয় এই বিতর্ককে আরও ঘনীভূত করেছে। তিনি রংপুর মেডিকেল কলেজ ছাত্রলীগের সাবেক নেতা এবং আওয়ামী লীগ-ঘনিষ্ঠ পেশাজীবী সংগঠন স্বাধীনতা চিকিৎসক পরিষদ (স্বাচিপ)-এর নীলফামারী জেলা কমিটির নির্বাহী সদস্য। ২০২৫ সালের ১০ এপ্রিল বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলনের ব্যানারে আয়োজিত মানববন্ধনে তাঁর বিরুদ্ধে অভিযোগ আনা হয় যে, তিনি আউটসোর্সিং নিয়োগের মাধ্যমে আওয়ামী লীগ নেতা-কর্মীদের পুনর্বাসনে সক্রিয় ভূমিকা রাখছেন। এমনকি চুক্তির মেয়াদ শেষ হওয়া কর্মীদের পুনর্বহালের জন্যও তিনি প্রশাসনিক প্রভাব খাটাচ্ছেন বলে অভিযোগ রয়েছে।
দুর্নীতির অভিযোগও ডা. আবু আল হাজ্জাজের ক্ষেত্রে নতুন নয়। ২০২৪ সালের এপ্রিলে দুর্নীতি দমন কমিশন (দুদক) নীলফামারী জেনারেল হাসপাতালে অভিযান চালিয়ে ওষুধ ও ক্রয়সংক্রান্ত নথি যাচাই করে। আন্দোলনকারীদের দাবি, রংপুরে কর্মরত থাকাকালীন সময়েও তাঁর বিরুদ্ধে দুর্নীতির মামলা ছিল। পাশাপাশি চিকিৎসকদের ফি সংক্রান্ত বিষয়ে ব্যক্তিগত হস্তক্ষেপের কারণে হাসপাতালের বৈকালিক সেবা বন্ধ হয়ে যাওয়ার অভিযোগে সাধারণ রোগীরা মারাত্মক ভোগান্তির শিকার হন।
সবচেয়ে গুরুতর প্রশ্ন উঠেছে পরিচালক (প্রশাসন) ডা. এবি এম আবু হানিফের ভূমিকা নিয়ে। অভিযোগ রয়েছে, তাঁর নীরবতা কিংবা সক্রিয় সমর্থন ছাড়া কোনো কর্মকর্তা মন্ত্রণালয়ের আদেশ অমান্য করে দীর্ঘদিন একই পদে বহাল থাকতে পারেন না। টিআইবি ও সনাকের সঙ্গে সংশ্লিষ্ট এক দায়িত্বশীল ব্যক্তি মন্তব্য করেছেন, এটি বিচ্ছিন্ন কোনো ঘটনা নয়; বরং স্বাস্থ্য খাতে দীর্ঘদিন ধরে চলে আসা প্রাতিষ্ঠানিক দুর্নীতির সংস্কৃতিরই প্রতিফলন।
স্বাস্থ্য সেবা বিভাগের বিতর্কিত ও নানা কেলেংকারী তে ওএসডি হওয়া একজন অতিরিক্ত সচিব পদমর্যাদার কর্মকর্তার সাথে ডা: আবু আল হাজ্জাজ এর ঘনিষ্টতার বিষয়টিও নিয়ামক ভুমিকা পালন করছে বলে মনে করেন সংশ্লিষ্টরা।
সরকারি বিধি অনুযায়ী তিন বছর পরপর বদলি বাধ্যতামূলক হলেও ডা. আবু আল হাজ্জাজ চার বছরের বেশি সময় একই কর্মস্থলে বহাল রয়েছেন। ফলে প্রশ্ন এখন আর ব্যক্তিকে ঘিরে নয়—প্রশ্ন হলো, এই ‘অদৃশ্য খুঁটি’ কারা এবং কেন নীতিনির্ধারক পর্যায় থেকে এখনো দৃশ্যমান ব্যবস্থা নেওয়া হচ্ছে না?
এই অভিযোগগুলোর নিরপেক্ষ ও দৃষ্টান্তমূলক তদন্ত না হলে স্বাস্থ্য প্রশাসনের ওপর জনগণের আস্থা যে আরও গভীর সংকটে পড়বে, সে আশঙ্কাই এখন সর্বত্র।
