পরিবেশ ও কৃষকের জীবন ঝুঁকিতে-
হাজার হাজার কোটি টাকা রাজস্ব ফাঁকি, নিম্নমানের কীটনাশক আমদানি এবং কৃষি ও কৃষকের জীবন বিপন্ন করার অভিযোগ উঠেছে বাংলাদেশ ক্রপ প্রোটেকশন অ্যাসোসিয়েশনের সভাপতি ও মিমপেক্স এগ্রোকেমিক্যাল লিমিটেডের ব্যবস্থাপনা পরিচালক এম সায়েদুজ্জামানের বিরুদ্ধে।
সূত্র জানায়, বালাইনাশক আমদানি ও বাজারজাতকরণে দীর্ঘদিন ধরে অনিয়ম ও দুর্নীতির মাধ্যমে তিনি বিপুল অঙ্কের রাজস্ব ফাঁকি দিয়ে আসছেন। অভিযোগ রয়েছে, তার নেতৃত্বে গড়ে ওঠা একটি শক্তিশালী সিন্ডিকেট নিম্নমানের বালাইনাশক আমদানি করে কৃষক পর্যায়ে পাঁচগুণ পর্যন্ত দামে বিক্রি করছে। এতে একদিকে কৃষক ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছেন, অন্যদিকে সরকার প্রতিবছর হাজার কোটি টাকার রাজস্ব থেকে বঞ্চিত হচ্ছে।
পিটাক ও এনবিআর সংশ্লিষ্টদের জড়িত থাকার অভিযোগ
তথ্যমতে, এসব অনিয়মে বালাইনাশক কারিগরি উপদেষ্টা কমিটি (পিটাক)-এর কিছু অসাধু সদস্য এবং জাতীয় রাজস্ব বোর্ড (এনবিআর)-এর একাধিক প্রভাবশালী কর্মকর্তা জড়িত ছিলেন বলে অভিযোগ রয়েছে। বিশেষ করে একক উৎস (Single Source) থেকে বালাইনাশক আমদানির অনুমোদন দিয়ে আমদানি নীতিমালা লঙ্ঘন করা হয়েছে বলে অভিযোগ উঠে এসেছে।
বালাইনাশক আইন ২০১৮ অনুযায়ী অন্তত দুটি দেশের তিনটি উৎস থেকে মূল্য যাচাই করে আমদানির বিধান থাকলেও, সায়েদুজ্জামান তার প্রভাব খাটিয়ে পিটাকের ৭৭ ও ৮৪তম সভায় একক উৎস অনুমোদন করান বলে জানা গেছে। সে সময় বাণিজ্য মন্ত্রণালয়ের প্রতিনিধি আমদানি নীতিমালা অনুসরণের প্রস্তাব দিলেও তা নাকচ করা হয় বলে অভিযোগ রয়েছে।
শত শত এলসিতে অনিয়ম, কর ফাঁকির অভিযোগ
এনবিআর সূত্রে জানা যায়, ভ্যালুয়েশন রিপোর্ট বিশ্লেষণে দেখা গেছে—বিভিন্ন সময়ে শত শত এলসির মাধ্যমে নিয়ম বহির্ভূতভাবে এগ্রোকেমিক্যাল আমদানি করা হয়েছে। বছরে প্রায় শত কোটি টাকা কর ফাঁকির অভিযোগও রয়েছে তার বিরুদ্ধে।
সম্প্রতি চট্টগ্রাম বন্দরে এগ্রোকেমিক্যাল ব্যবসায়ীদের প্রায় এক হাজার কোটি টাকার পণ্য অনিয়মের কারণে আটকে থাকলেও, অন্যান্য ব্যবসায়ীরা জরিমানা দিলেও সায়েদুজ্জামানের প্রতিষ্ঠান কোনো জরিমানা ছাড়াই পণ্য ছাড়িয়ে নেয়—এ নিয়েও প্রশ্ন উঠেছে।

নিম্নমানের পণ্যে কৃষক ক্ষতিগ্রস্ত
বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানের বালাইনাশক পরীক্ষা করে দেখা গেছে, ঘোষিত কেমিক্যাল উপাদানের তুলনায় অনেক পণ্যে ১ থেকে ৫০ শতাংশ পর্যন্ত ঘাটতি রয়েছে। সিরাজগঞ্জ সদর উপজেলা থেকে সংগৃহীত ১৬টি রাসায়নিক সারের নমুনা পরীক্ষায় সবগুলোতেই ভেজাল পাওয়া যায়, যার মধ্যে মিমপেক্স এগ্রোর পণ্যও রয়েছে বলে জানা গেছে।
এতে ফসল উৎপাদন ব্যাহত হচ্ছে, ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছেন প্রান্তিক কৃষক, পাশাপাশি পরিবেশ ও জনস্বাস্থ্যের ওপর মারাত্মক ঝুঁকি তৈরি হচ্ছে বলে বিশেষজ্ঞরা মনে করছেন।
বিলাসী জীবনযাপন ও সম্পদের উৎস নিয়ে প্রশ্ন
অভিযোগ রয়েছে, চট্টগ্রাম বন্দর থেকে সায়েদুজ্জামান তার প্রতিষ্ঠানের নামে হ্যামার, মার্সিডিজ ও ল্যান্ড ক্রুজারের মতো বিলাসবহুল গাড়ি আমদানি করেছেন, যার মূল্য কয়েকশ কোটি টাকা। তবে তার আয়কর নথির সঙ্গে প্রকৃত আয়ের কোনো মিল পাওয়া যায়নি বলে অভিযোগ উঠেছে। এনবিআর বা সংশ্লিষ্ট কোনো সংস্থা এখনো তার সম্পদের উৎস অনুসন্ধান করেনি।
তদন্ত কমিটি গঠন হলেও অগ্রগতি নেই
কৃষি মন্ত্রণালয়ের উপকরণ-২ শাখার স্মারক নম্বর ১২.০০.০০০০.০২৬.৩৯.০০৫.২২.২৭৪ (তারিখ: ১৫ অক্টোবর ২০২৪) অনুযায়ী তিন সদস্যবিশিষ্ট একটি তদন্ত কমিটি গঠন করা হয়। একই সঙ্গে তদন্ত শেষ না হওয়া পর্যন্ত মিমপেক্স এগ্রোকেমিক্যালের আমদানি, রপ্তানি ও মাঠপর্যায়ে বিক্রি বন্ধের নির্দেশ দেওয়া হয়। তবে তদন্তের বর্তমান অগ্রগতি সম্পর্কে কোনো তথ্য পাওয়া যায়নি।
মানববন্ধন ও গ্রেপ্তারের দাবি
এর আগে জাতীয় প্রেসক্লাবের সামনে ভোক্তা অধিকার সংরক্ষণ সোসাইটির উদ্যোগে মানববন্ধন কর্মসূচি পালিত হয়। সেখানে নিম্নমানের বালাইনাশক আমদানি ও উচ্চমূল্যে বিক্রির প্রতিবাদ জানিয়ে এম সায়েদুজ্জামানের দৃষ্টান্তমূলক শাস্তির দাবি জানানো হয়।
কৃষি উপকরণভিত্তিক দেশীয় শিল্পপ্রতিষ্ঠানের মালিকরা বলছেন, দীর্ঘদিন ধরে এই সিন্ডিকেট কৃষকদের জিম্মি করে রেখেছে এবং দেশীয় শিল্পকে ধ্বংসের মুখে ঠেলে দিয়েছে। তারা সংশ্লিষ্ট সকলের বিরুদ্ধে দ্রুত তদন্ত, গ্রেপ্তার ও শাস্তিমূলক ব্যবস্থার দাবি জানিয়েছেন।

