বাংলাদেশ ও ভারতের সম্পর্ককে শুধু দুই প্রতিবেশী রাষ্ট্রের সম্পর্ক হিসেবে দেখলে ভুল হবে। এই সম্পর্কের ভিত্তি বহু শতাব্দীর ইতিহাস, ভৌগোলিক বাস্তবতা, ভাষা, সংস্কৃতি, অর্থনীতি এবং মানুষের আন্তরিক যোগাযোগের ওপর দাঁড়িয়ে আছে। রাজনৈতিক মতপার্থক্য বা সময়ে সময়ে উদ্ভূত বিভিন্ন দ্বিপাক্ষিক ইস্যু থাকলেও একটি বাস্তবতা অস্বীকার করার সুযোগ নেই দুই দেশ বহু ক্ষেত্রেই একে অপরের পরিপূরক।

বাংলাদেশ ও ভারতের মধ্যে রয়েছে বিশ্বের অন্যতম দীর্ঘ স্থলসীমান্ত। সীমান্তের দুই পাশেই বসবাসকারী মানুষের ভাষা, সংস্কৃতি, খাদ্যাভ্যাস, সাহিত্য, সংগীত, উৎসব ও পারিবারিক বন্ধনের মধ্যে অসংখ্য মিল রয়েছে। বাংলা ভাষা দুই দেশের কোটি কোটি মানুষের হৃদয়ের ভাষা। সাহিত্য, নাটক, চলচ্চিত্র, সংগীত এবং শিল্প-সংস্কৃতির আদান-প্রদান দুই দেশের জনগণকে আরও কাছাকাছি নিয়ে এসেছে। এই সাংস্কৃতিক সেতুবন্ধন রাজনৈতিক সম্পর্কের বাইরেও একটি শক্তিশালী মানবিক ভিত্তি তৈরি করেছে।

অর্থনৈতিক ক্ষেত্রেও দুই দেশের সম্পর্ক ক্রমেই গভীর হচ্ছে। বাংলাদেশের শিল্পের জন্য প্রয়োজনীয় কাঁচামালের একটি অংশ ভারত থেকে আসে, আবার বাংলাদেশের তৈরি পোশাক, ওষুধ, পাট ও পাটজাত পণ্যসহ বিভিন্ন পণ্যের জন্য ভারত একটি গুরুত্বপূর্ণ বাজার। সীমান্ত বাণিজ্য, বিদ্যুৎ সহযোগিতা, রেল ও সড়ক যোগাযোগ, নৌপথ এবং আঞ্চলিক সংযোগ এসব উদ্যোগ দুই দেশের অর্থনীতিকে আরও গতিশীল করছে। এ কারণে এক দেশের স্থিতিশীলতা ও উন্নয়ন অন্য দেশের জন্যও ইতিবাচক প্রভাব বয়ে আনে।

প্রতিবছর অসংখ্য বাংলাদেশি চিকিৎসা, শিক্ষা, ব্যবসা, পর্যটন ও পারিবারিক কারণে ভারতে যান। একইভাবে বহু ভারতীয় বাংলাদেশে ব্যবসা, বিনিয়োগ ও বিভিন্ন পেশাগত কাজে আসেন। এই মানুষের সঙ্গে মানুষের সম্পর্কই দুই দেশের প্রকৃত শক্তি। ভিসা, পর্যটন কিংবা বাণিজ্যের পরিসংখ্যানের বাইরেও রয়েছে বিশ্বাস, পরিচিতি এবং দীর্ঘদিনের সামাজিক যোগাযোগ।

অবশ্যই দুই দেশের মধ্যে কিছু অমীমাংসিত বিষয় রয়েছে—সীমান্তে প্রাণহানি, নদীর পানিবণ্টন, বাণিজ্য ভারসাম্যসহ বিভিন্ন ইস্যু নিয়ে আলোচনা চলমান। এসব বিষয়ে উভয় দেশেরই দায়িত্ব রয়েছে পারস্পরিক সম্মান, সংলাপ এবং আন্তর্জাতিক নীতিমালার আলোকে সমাধান খুঁজে বের করার। সুসম্পর্কের অর্থ এই নয় যে মতপার্থক্য থাকবে না বরং মতপার্থক্যকে শান্তিপূর্ণভাবে সমাধান করার সক্ষমতাই পরিণত সম্পর্কের পরিচয়।

আজকের বিশ্বে প্রতিবেশীকে উপেক্ষা করে টেকসই উন্নয়ন সম্ভব নয়। বাংলাদেশ ও ভারত প্রতিযোগী নয় বরং এমন দুই প্রতিবেশী, যাদের অগ্রগতি, স্থিতিশীলতা এবং সমৃদ্ধি অনেক ক্ষেত্রেই পরস্পরের সঙ্গে জড়িত। ইতিহাস, ভাষা, সংস্কৃতি এবং অর্থনৈতিক বাস্তবতা আমাদের বারবার মনে করিয়ে দেয় সহযোগিতা, পারস্পরিক সম্মান এবং আস্থার ভিত্তিতেই দুই দেশের ভবিষ্যৎ আরও শক্তিশালী হতে পারে।

*লেখক: গাজী জহিরুল ইসলাম, বাংলাদেশী গণমাধ্যম কর্মী।*

By Gazi Zahirul Islam

গাজী জহিরুল ইসলাম।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *