উল্লাপাড়ায় মধু স্থানীয় চাহিদা মিটিয়ে রফতানি হচ্ছে বিদেশে
উল্লাপাড়ায় খাঁচা পদ্ধতিতে চাষকৃত মৌমাছির মাধ্যমে সরিষা ফুলের মধু সংগ্রহ ব্যাপক সাড়া ফেলেছে। উল্লাপাড়ায় প্রায় প্রতিটি অঞ্চলেই সরিষা ফুলের মধু সংগ্রহে ব্যস্ত সময় পার করছেন মৌ খামারিরা।
উপজেলা কয়ড়া, মোহনপুর, বড়পাঙ্গাসী, উধুনিয়া, বাঙ্গালা, দূর্গনগর ইউনিয়নের প্রতিটি বিল অঞ্চলের সরিষার ক্ষেতের পাশে বসানো হয়েছে মধু সংগ্রহের বাক্স। কৃষি বিভাগের সহযোগিতায় ও ব্যক্তি উদ্যোগে প্রায় ১২৭টি মৌ খামারি সরিষা ফুলের মধু সংগ্রহ করছেন। কৃষি বিভাগের তথ্য মতে, এবার উল্লাপাড়া উপজেলায় ১৯৫ মে. টন মধু সংগ্রহের লক্ষ্যমাত্রা ধরা হয়েছে, যার বাজারদর অন্তত ৬ কোটি ৮২ লাখ ৫০ হাজার টাকা। এই মধু স্থানীয় চাহিদা মিটিয়ে সরবরাহ হচ্ছে বিদেশেও।
উপজেলার প্রায় প্রতিটি অঞ্চলের কৃষক নিজেদের জমিতে কমবেশি সরিষার আবাদ করে থাকেন। বিশেষ করে বিল অঞ্চলগুলোতে গেলে মাঠজুড়ে সরিষা ফুলের হলুদের সমারোহে দৃষ্টি জুড়িয়ে যাবে। বিগত দিনগুলোর চেয়ে বর্তমানে সরিষার আবাদ ও ফলন বৃদ্ধি পেয়েছে। এর অন্যতম কারণ ফসলের মাঠের পাশে মৌমাছির খামার। এই মৌমাছি মধু সংগ্রহ করতে গিয়ে পরাগায়ন ঘটাচ্ছে ফসলের। এ কারণে স্বাভাবিকের চেয়ে অনেক বেশি ফলন পাচ্ছেন কৃষকরা। তাই খাঁচায় মৌমাছি দিয়ে মধু সংগ্রহের মাধ্যমে একদিকে যেমন বহু পুষ্টিগুণসম্পন্ন মধু পাওয়া যাচ্ছে, অন্যদিকে চাষিদের ফলনও বৃদ্ধি পাচ্ছে বহুগুণ।
প্রাচীনকাল থেকেই বিশ্বের সব স্থানে মধুর কদর রয়েছে ব্যাপক। মধু পুষ্টিকর ও শক্তিবর্ধক পানীয় হিসেবে যুগ যুগ ধরে মানুষ ব্যবহার করে আসছে। বাংলাদেশে শীতের সময় মধুর প্রচলন ও ব্যবহার বহুগুণ বেড়ে যায়। আর এই মধুর চাহিদা অনেকাংশে পূরণ করে থাকে সরিষা ফুল থেকে সংগৃহীত মধু। কৃষিসমৃদ্ধ সিরাজগঞ্জের উল্লাপাড়া তাই শীতের এই সময়ে সরিষা ফুলের মধু দেশের চাহিদা মিটিয়ে সরবরাহ হচ্ছে বিদেশে।
উপজেলার বড়পাঙ্গাসী ইউনিয়নের খাদুলী গ্রামের সম্রাট আলী বলেন, আগে কখনও আমরা এই সরিষা ফুল থেকে মধু সংগ্রহ করা যায়, সেটা জানতাম না। এই সময়ে বিভিন্ন বাড়িতে গাছের ডালে মৌমাছি বাসা করত। সেই মৌমাছির চাক থেকে আমরা মধু সংগ্রহ করতাম। আর এখন খাঁচায় চাষকৃত মৌমাছি দিয়ে মধু সংগ্রহ করছে। এই মৌমাছির কারণে আমাদের সরিষার ফলন বৃদ্ধি পেয়েছে আর মধুও পাচ্ছি।
স্থানীয় মধু বিক্রেতা জাবেদ বলেন, আমি প্রতিবছরই খামারিদের কাছ থেকে মধু নিয়ে ফেসবুক পেজের মাধ্যমে অনলাইনে বিক্রি করি। এর মাধ্যমে আমাদের বাড়তি আয় হচ্ছে।
মৌ খামারি ভাটবেড়া গ্রামের সুমন, আফছার বলেন, প্রতিবছরই এই সরিষা ফুলের মধু সংগ্রহের কাজ করছি। শুধু সরিষা নয়, লিচু ফুল, তিলের ফুলের মধুও আমরা সংগ্রহ করি। বিভিন্ন কোম্পানি আমাদের কাছ থেকে মধু কিনে নিয়ে যায়। তবে এই বছর বৃষ্টির কারণে অনেক মৌমাছি মারা গেছে। তাই কিছুটা হলেও আমাদের ক্ষতি হয়েছে। তবে আবহাওয়া ভালো থাকলে এই ক্ষতি পুষিয়ে নিতে পারব। উপজেলা কৃষি অফিস আমাদের এই মধু সংগ্রহের কাজে সহযোগিতা করে থাকে। খামারীরা জানান, কৃষকরা সরিষায় অতিরিক্ত বিষ প্রয়োগ করায় আমাদের খামারীদের মধু সংগ্রহ করতে ব্যাপক ক্ষতি করছে তাই উপজেলা কৃষি অফিসের কাছে আমাদের অনুরোধ কৃষিকদের অতিরিক্ত বিষ প্রয়োগ বাধা প্রদান করবে এবং বেশি মধু সংগ্রহ করতে আমাদের সহযোগিতা করবে।
উপজেলা কৃষি অফিসার সুবর্ণা ইয়াসমিন -সুমী জানান, মধু পুষ্টিগুণসমৃদ্ধ শক্তিবর্ধক ও সর্বরোগের মহৌষধ। উল্লাপাড়া উপজেলা যেহেতু কৃষিসমৃদ্ধ অঞ্চল, এখানে শীতের এই সময়ে সরিষার আবাদ ব্যাপক হয়ে থাকে। আর এই সরিষা ফুল থেকে মৌ খামারিরা মধু সংগ্রহ করে থাকেন। চাষকৃত বিশেষ জাতের এই মৌমাছি সরিষা ফুল থেকে মধু সংগ্রহ করে খাঁচায় নিয়ে জমা করেন।
এর ফলে একদিকে ফসলের পরাগায়নে ফলন বৃদ্ধি পাচ্ছে অন্যদিকে মধু সংগ্রহ করে পুষ্টির চাহিদার পাশাপাশি বাড়তি আয় করছেন খামারিরা। এ উপজেলা এবারে প্রায় ১৯৫ মে. টন সরিষা ফুলের মধু সংগ্রহ হবে, যার বাজারদর প্রায় ৬ কোটি ৮২ লাখ ৫০ হাজার টাকা। এই সরিষার মধু দেশি ও বিদেশি বিভিন্ন কোম্পানি সংগ্রহ করে প্রক্রিয়াজাত করে বাজারে বিক্রি করছে। তিনি আরও বলেন, এ উপজেলায় এবার প্রায় ২৪৬০৫ হেক্টর জমিতে সরিষার আবাদ হয়েছে। আর ১২৭ জন তালিকাভুক্ত খামারি উপজেলার বিভিন্ন প্রান্তে ১৫৩৫ হাজার মৌবাক্স স্থাপন করেছেন। মৌ খামারিদের আমরা নানাভাবে সহযোগিতা করে আসছি।
